12/05/2018

বাবা-মায়ের বলা যে ১০টি কথা শিশুদের বিপদে মুখে ঠেলে দেয়..

সন্তান বাবা-মার সবচেয়ে বড় সম্পদ। সন্তানকে সঠিক ভাবে বড় করে তোলার বিষয়টি বাবা মায়ের কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কাজের অনেক চাপে অনেক সময় আমরা আমাদের সন্তানদের এমন কিছু ভুল কথা বলে থাকি তাদের ভবিষ্যতে বিপথগামী করে তোলে। শাসন করা তারই সাজে, আদর করে যে। এই বাক্যটি মনে রেখে বাচ্চাদের শাসন করেন মা-বাবা বা পরিবারের গুরুজনরা। কিন্তু এই শাসন করতে গিয়েই তারা এমন সব কথা বা বাক্য ব্যবহার করেন যা তার ব্যক্তিত্বে অনেকখানি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শুধু ব্যক্তিত্বে নয় এটি সন্তান ও পিতা মাতার সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

মনে রাখতে হবে আপনার সন্তান সেসব জিনিসই শিখবে যা আপনার বা তার চারপাশের পরিবেশ থেকে দেখে। তাই সন্তানের ব্যপারে প্রথম থেকেই সচেতন থাকতে হবে অভিভাবকদের যাতে কোন খারাপ বা বিরুপ আচরণের প্রভাব শিশুর উপর না পরে। আপনার আচার-আচরণ, কথা বলার ভঙ্গি, কাজকর্ম সবকিছুই শিশুমনে জায়গা দখল করে নেয়, আর তা থেকেই তার ভবিষ্যৎ কাজকর্মের গতি প্রকৃতি নির্ধারিত হয়। চলুন জেনে নিই নিজের অজান্তে বলা কোন কথাগুলি বিপথগামী করতে পারে আপনার সন্তানকে।

 

১. বড়দের কথা শোনা উচিত:

আমরা বাচ্চাদের ভালো গুনাবলি তৈরীর জন্য সবচেয়ে বেশি যে কথাটি বলি তা হলো “বড়দের কথা শোনা উচিত”। এ কথা থেকে শিশু ভাবতে পারে যে‘সব বড়ই নিশ্চয়ই ভালো এবং সৎ। তারা যা বলবে আমাকে তাই করতে হবে।’ ফলে বাচ্চারা অপরিচিত কাউকে সৎ ভেবে তার কথা শুনতে গিয়ে বিপদে পড়তে পারে আপনার সন্তান। তাই এই কথাটির পরিবর্তে বলুন ‘মা ও বাবার কথা শুনতে হয়’। এই বাক্যটি আপনার সন্তান চিন্তা করতে বাধ্য করবে এবং অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলা উচিত সেটা শেখার তাগিদ দেবে।

 

২. অমুকের মত হতে পারো না?

কখনোই আপনার সন্তানকে তার ভাইবোন বা অন্য কারো সাথে তুলনা করবেন না। প্রতিটি সন্তান এবং তাদের ব্যক্তিত্ব স্বতন্ত্র। প্রতিটি মানুষই তার নিজের ব্যক্তিত্ব নিয়ে বড় হয়ে ওঠে। সন্তানকে অন্য কারো সাথে তুলনা করলে তার ব্যক্তিত্বে প্রভাব ফেলে। ফলে নিজের ভেতর হীনমন্যতা সৃষ্টি হয়। তাই এই কথাটির পরিবর্তে যে বিষয়ে সে দূর্বল তাকে আরো আগ্রহী ও চেষ্টা করতে বলুন। পাশাপাশি তাকে সাহস দিন যে “তুমি পারবে”। এতে আপনার সন্তান আগের তুলনায় অনেক বেশী আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে।

 

৩. ‘দিনে দিনে বোকা হচ্ছো’:

অনেক সময় শিশুরা ভুল করে কিছু কাজ করে বসে। হতে পারে শিশু কাউকে সালাম বা শুভেচ্ছা জানায়নি, কিন্তু তাই বলে তাকে সামনাসামনি ‘দিনে দিনে বোকা হচ্ছো’ বলে বকা দিলে তা শিশুকে বিব্রতকর ও অস্বস্থিকর অবস্থায় ফেলবে, কারণ এটা তার জন্য একটা নতুন পরিস্থিতি। বকাঝকা না করে বুঝিয়ে তাকে সাহায্য করুন।

 

৪. কান্না বন্ধ করো:

বাচ্চাদের কান্নাকাটি করাটা খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। এ ধরনের কথায় শিশুরা ভাবে যে ‘নিজের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করা খুবই খারাপ কাজ। কাঁদলে আমাকে ধমক দেওয়া হবে।’ ফলে সে এক ধরনের নীরবতার মাঝে বড় হয়ে উঠবে। তবে এখনই হোক বা দেরিতে, লুকিয়ে রাখা এই আবেগগুলোই রাগ অথবা কান্নার মাধ্যমে বের হয়ে আসবে। তাই এ কথাগুলি পরিবর্তে শিশুকে জিজ্ঞাসা করুন ‘কী তোমাকে বিরক্ত করছে? কেন কাঁদছ তুমি?’ যদি বাচ্চারা পড়ে গিয়ে ব্যথা পায়, তাহলে বলা উচিত ‘তুমি কি ব্যথা বা ভয় পেয়ে কাঁদছ?’ এ ধরনের কথা আপনার সন্তানকে আবেগ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দেবে।

 

৫. আমার বাবুটাতো সব জানে:

কখনও ভুলেও আপনার বাচ্চাকে বলবেন না যে তুমি সব জানে। এ জাতীয় প্রশংসা শিশুকে কোনো কিছু করতে উৎসাহিত করেনা বরং তাদের কোনো কিছু শেখা থেকে বিরত রাখে। কারণ তারা মনে করে ‘আমি খুব স্মার্ট এবং আমি সবই জানি।’ যা পরবর্তীতে অভ্যাসে পরিণত হয় এবং আপনার সন্তানকে শিক্ষা লাভ থেকে দূরে রাখে।

 

৬. যা বলার বাসায় গিয়ে বলব:

এধরনের কথায় শিশু মনে করে ‘বাসায় গিয়ে মা-বাবা আমার গায়ে হাত তুলতে পারে। তারা আমাকে পছন্দ করে না। আমি বাসায় যেতে চাই না।’ এই কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গে মা-বাবার প্রতি ভালোবাসাটা হুমকিতে রূপ নেয় এবং বাচ্চারা বাসাটাকে শাস্তির জায়গা হিসেবে মনে করতে থাকে। এ কথাগুলো বলার পরিবর্তে তাকে বুঝিয়ে বলুন কেন আপনি তার কথায় বা কাজে কষ্ট পেয়েছেন। এই কথাটি শোনার পর বাচ্চারা আপনার আবেগকে মূল্য দেবে এবং ভবিষ্যতে কোনো দুষ্টুমি করার আগে বিবেচনা করবে।

 

৭. কার কাছে শিখেছ?

এই কথাটি বলে আপনি আপনার শিশুকে জানিয়ে দিচ্ছেন যে সে যে দুষ্টুমিটা করেছে তা আপনি জানেন না। ফলে সে শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানো শিখবে। এর পরিবর্তে বলুন ‘কেন তুমি এটা করেছ?’ এই বাক্যটি আপনার বাচ্চাকে বলতে সাহায্য করবে যে দুষ্টুমিটা সে নিজে থেকে করেছে নাকি কারো উৎসাহে করেছে। তাকে তার দোষ স্বীকারের যথেষ্ট সুযোগ দিন।

 

৮. আমার বাচ্চা তো খুব সুন্দর!

আমার বাবু টা তো খুব সুন্দর, তুমি খুবই সুন্দর, দেখ তুমি কত সুন্দর- এই ধরনের বাক্য শোনার মাধ্যমে মেয়ে শিশুরা ছোট বয়স থেকেই ভাবতে শেখে পৃথিবী তাদের কাছ থেকে কেমন থাকাটা আশা করে। ফলে তারা কেবলমাত্র নিজেদের সৌন্দর্যের প্রতি বেশি নজর দেওয়া শুরু করে।

 

৯. বড় হও তারপর জানতে পারবে!

এ ধরনের কথা বাচ্চারা ভাবে জানতে চাওয়াটা অপরাধ। যদি আপনার সন্তান আপনাকে অস্বস্তিকর কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে এবং যথাযথ জবাব না পায়, তাহলে অন্য কোনো উৎস থেকে সে তার প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে এবং তার খুঁজে পাওয়া ব্যক্তিটি প্রশ্নটির উপযুক্ত উত্তর না দিয়ে ভুল তথ্যও দিতে পারে। আপনার সন্তানকে নিরাশ করবেন না। যদি সে আপনাকে কোনো প্রশ্ন করে, তার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করুন। এই পদ্ধতিতে তার ওপর আপনার কর্তৃত্ব বজায় থাকবে এবং সেও আপনার ওপর বিশ্বাস হারাবে না।

 

১০. এটা তোমাকে কে করতে বলেছে?

নতুন কোনো কিছু শেখার ক্ষেত্রে শিশুরা কয়েকবার ব্যর্থ হবেই। কিন্তু আপনি যদি শুরু থেকেই তাদের ব্যর্থতার মধ্যে বারবার নিজের নির্দেশনা দিতে থাকেন, তাহলে তাদের অনুভূতি হবে তারা কাজটিতে কোনোভাবেই সক্ষম হবে না।

কেন বলেন, এটা শিশুকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, ‘আমি এটা করতে পারবো না, শুধুমাত্র বড়রা জানে কিভাবে এটা করতে হবে।’ যা আসলে শিশুর আস্থা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে কাজ করে। এমন কিছু কথা আছে যা বাচ্চাদের সামনে বলা উচিত নয়। অথচ অসাবধান হয়ে আমরা প্রায় সময়ই এইরকম কথা বাচ্চাদেরকে বলে থাকি। এই কথাগুলো আপনার বাড়ন্ত শিশুকে বলা থেকে বিরত থাকুন।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook

Instagram

You Tube

"At the end of Love there is Pure Love"

Pure Love © 2019 | Privacy Policy